আহমেদ হাসান, কামারখন্দ উপজেলা প্রতিনিধিঃ
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার, , পাবনা জেলা কারাগার ও সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে একটি হত্যা মামলার আসামী হয়ে যাবজ্জীবন জেল হাজতে দীর্ঘ সময় পার করেছেন মুক্তিপ্রাপ্ত সিরাজগঞ্জ শাহজাদপুরের আমির হোসেন সবুজ। ২৩ বছরের কারাজীবনে কারাভোগীদের জীবনমান ও হাজতী/কয়েদীদের নানান স্বপ্নের চিত্র ‘কারারুদ্ধ বিবেক’ বইটির মাধ্যমে প্রকাশ করেন। এছাড়াও তিনি কারাজীবনে অসংখ্য, গল্প, কবিতা, উপন্যাসও প্রকাশ করেছেন। তিনি শাহজাদপুর পৌর এলাকার ২ নং ওয়ার্ডের মৃত আবুল হোসেন চুন্নু মিয়ার ছেলে।
কারাগারের হাজতি কয়েদি বন্দি ভাই-বোনদের সম্পর্কে মাননীয় আই জি প্রিজন্স, মহোদয়ের নিকট দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি তার পত্রে উল্লেখ করেন, প্রকৃতির ভয়াবহ রুদ্ররোষ থেকে কারাবন্দি ভাই-বোনদের রক্ষার জন্য আবেদন করছি। কারাগার গুলো যেহেতু কারা বিধি অনুযায়ী চলে। তাই আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করি, কারাগার গুলোতে প্রতিদিন সকালে বন্দীদের রুটিন মাফিক প্রতিদিন একবার গোসলের নিয়ম আছে। কিন্তু বর্তমান যে ধরিত্রির ভয়াবহ অবস্থা মানুষ বাঁচাতে, দয়া করে আপনারা কারাবিধির নিয়ম টেনে আনবেন না। আপনি যেহেতু বাংলাদেশের প্রতিটি কারাগারের একমাত্র অভিভাবক, তাই আপনার কাছে আশা করব, প্রতিটি কারাগারের জন্য বিভাগীয় কর্মকর্তা ডিআইজি প্রিজন্স এবং জেল সুপার মহোদয়, জেলার সাহেব সহ আপনার কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জরুরি নির্দেশনা জারি করুন, প্রতিটি বন্দি ভাইয়েরা এবং বোনেরা শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকার জন্য যখন ইচ্ছা তখন গোসলের নির্দেশনা জারি করুন এবং বর্তমান কারাগার গুলো যেগুলো আধুনিক করেছে। সেগুলোর জানালাগুলো এতই ছোট শীতের দিনেও মানুষ গাদাগাদি মানুষের ভিড়ে স্ট্রোক করেন! আর এখন তো কথাই নেই ব্রিটিশ আমলের কারাগার গুলোতে প্রতিটি জানলা দরজা মাটি লেভেল থেকে ছাদ পর্যন্ত তাই অনায়াসে বাতাস ঢুকতে পারে এবং বের হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের পি ডব্লিউ ডির ইঞ্জিনিয়াররা এতটাই কসাই ছোট্ট ছোট্ট দরজা জানালা জল্লাদ শাজাহানকেও হার মানতে হবে। তাই আমি দাবি করব অতি দ্রুত মাটি লেভেল থেকে ছাদ পর্যন্ত প্রতিটি জানালা দরজা প্রশস্ত করতে হবে। ব্রিটিশ আমলের কারাগার গুলোর মতো দরজা জানালা করলে অন্ততবন্দীরা কিছুটা হলেও বাঁচতে পারবে। আর ওয়ার্ড এর ভেতর আপাতত জানালার কাছে কোন প্রকার ব্যাগ কাপড়-চোপড় ঝুলানো সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করে দিন। অন্তত এই গরম কালে। যেহেতু আমি ২২ বছর সাত মাস ১১দিন একটি মিথ্যা মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশ নিয়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, পাবনা জেলা কারাগার, এবং সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে ছিলাম। তাই সমস্যাগুলো
অকপটেই আমি আপনার নিকট তুলে ধরছি। কারণ মুক্ত জগতে আমি নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত ন্যায় বিচার পাইনি। পারিবারিক ভাবে অর্থবিত্তের অভাব ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ কারা পরিবার জেলার, সুপার, কারারক্ষী ভাইয়েরা ২৩ টি বছর তাদের ভালোবাসা দ্বারা আমায় বাঁচিয়ে রেখেছিলেন পরম স্নেহ ভালোবাসার কোন অভাব বোধ করিনি। তাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কারাগারের প্রতিটি কর্মকর্তা কর্মচারীর প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা থাকবে। এখন মুক্ত জগতে যদি কখনো ভালো কিছু খেতে বসি, বন্দী ভাইদের কথা মনে পড়ে কষ্ট পাই। আমি আপনার মাধ্যমে সকল কারা কর্মকর্তা ও কারারক্ষী ভাইদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি মৃত্যুর মিছিলের হাত থেকে অন্তত হাজতি কয়েদি ভাই-বোনদের রক্ষা করুন। কারাগারে ৮০% মানুষ সম্পূর্ণভাবে নিরপরাধ? এবং প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসক মহোদয় আপনারা বর্তমান সময়ে রাতের বেলা কারাগার গুলো পরিদর্শন করুন জজ সাহেবদের নিয়ে, তাহলে প্র্যাকটিকাল দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবেন হাবিয়া দোজখে পুড়ে মরছে বাংলাদেশের লাখোবন্দী ভাই বোনেরা। বৃদ্ধ বন্দী, শারীরিকভাবে অক্ষম, চলাফেরা করতে পারেনা। তাদের অবিলম্বে সিভিল সার্জন, সরকারি সার্জন, আরএমও সাহেব, জেলা জজ সাহেব এবং জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সমন্বয় আনফিট করে, অচল বয়বৃদ্ধ প্রতিবন্ধী পঙ্গু বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কারা বিধির ৫৬৯ ধারায় মুক্তি প্রাপ্ত কয়েদি বন্দির সংখ্যা প্রায় ১৫-২০ হাজার হবে তাদেরকে মুক্তি দিতে হবে। কারণ তারা অনেক বেশি সাজা খেটে ফেলেছে। পাঁচ সাত বছর বেশি দণ্ড ভোগ বেশি করে ফেলেছে? আবার আপনারা ভাববেন না আমি ক্রিমিনালদের পক্ষে সাফাই গাইছি? কারণ আমার ২৩ বছরের অভিজ্ঞতায় নিবিড় ভাবে অনুসন্ধান করে দেখেছি নিরপরাধ বন্দির সংখ্যা ৮০% আর অরিজিনাল ক্রিমিনালদের সংখ্যা ২০% ! কারাগারের ভেতর কারা হাসপাতালগুলোর সেবার মান উন্নত করতে হবে। বিশেষ করে সহকারি সার্জন, ফার্মাসিস্ট, মহিলা ডাক্তার, প্যাথলজিস্ট এবং হাসপাতাল রাইটারদের আন্তরিক এবং মানবিক হতে হবে। ২৪ ঘন্টা চিকিৎসক নিশ্চিত করতে হবে এবং আরেকটি ভয়াবহ সমস্যা সেটা আমার জেলা, সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের পানির পাম্প মেশিনে পর্যাপ্ত পরিমাণের কাদা মাখানো আয়রন বলা চলে পানি পান করার সম্পূর্ণ অযোগ্য। এ জন্য প্রতিটি বন্দি ভাইয়ের পেটের সমস্যা যেমন আমাশয়, চুলকানি, পচারি, মারাত্মক আকারে স্কিন ডিজিজ। এটার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। আমি কারাগারে থাকা অবস্থায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় সত্তর হাজার টাকা খরচ করে সাবমারসিবল পাম্প লাগিয়ে দিয়েছিলাম। সেটারও এখন মৃত্যুবার্ষিকী পালন হচ্ছে? তাই সরকারি অর্থায়নে পি ডব্লিউ ডির চোরদের বাদ দিয়ে কারাগারের জেল সুপার মহোদয় কে ভালো মানের সাবমারসিবল পানির পাম্পের ব্যবস্থা করাটা অতীব জরুরী। হয়তো অনধিকার চর্চা করে ফেললাম ‘রাখিবো নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ”।
এই স্লোগানটা একদম মিথ্যে? কারণ একটা বন্দি যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করে যখন ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন রিক্ত নিঃস্ব শূন্য হয়ে বাড়িতে ফেরে। বিদেশে প্রত্যেকটা বন্দীর দন্ডের মেয়াদ শেষে সরকার সামাজিক স্ট্যাটাস বুঝে একটা মোটা অংকের টাকা হাতে তুলে দেন। বাকি জীবনটা সৎভাবে পালন করার জন্য। কিন্তু আমার দেশে কারাগার থেকে বিদায় দেন এক বুক হতাশা আর চোখে মুখে শূন্যতা।