নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

ছোটবেলায় ভাবিনি কখনও আবৃত্তিকে পেশা করব। একটু মনে হয় ভুল বললাম – ভাবিনি নেশা কোনদিন পেশা হয়ে যাবে।তারজন্য কিন্তু অবিরাম অনেক বিদ্রুপ তাচ্ছিল্য সহ্য করতে হয়েছে আমাকে।তার আসল কারন মনে হয় আবৃত্তিকে পেশা করে জীবনে এগিয়ে যাবার কথা কেউ সেভাবে ভাবে না। আমাদের ছোটবেলায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করা, প্রতিযোগিতায় প্রথম দ্বিতীয় হওয়া বা স্কুলের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া এসব খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। একত্রিত হলেই গানের লড়াই, মেমারি গেম ইত্যাদির সঙ্গে চলতো আবৃত্তি, গান এসব।তবে এই আবৃত্তির নেশা যে আমার চলার পথে পেশা হয়ে আমাকে বহু মানুষের ভালোবাসা দেবে তা আমার অতি কাছের জনরাও বুঝতে পারেনি। যেমন আমার বাবা মা ও ঠাকুমা।

আমাদের পরিবার ছিল সংস্কৃতি মনস্ক।বাবার হাতেই আমার আবৃত্তির পথ চলা শুরু। আমার মা ভালো গান গাইতেন।স্কুল শিক্ষিকা আমার মা যখন কাজের ফাঁকে গুনগুন করে গান গাইতেন আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।সেই সুর ও হয়তো আমাদের মধ্যে এনেছিল শিল্পের প্রতি এই অদম্য ভালো লাগা।আমরা মানে আমি আর আমার ছোট ভাই।ভাই দুষ্টু হলেও আমি কিন্তু মা বাবার বেশ বাধ্য ছিলাম। তবে অবাধ্য না হলেও চলতি পথের জীবন আমার পছন্দ ছিল না, তাই লেখাপড়ায় ভালো হয়েও বেছে নিয়েছিলাম এক ভিন্ন পথ। সবার মতো ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা নিদেনপক্ষে একটা দামী সরকারি চাকরির হাতছানি কে উপেক্ষা করে এগিয়ে গিয়েছিলাম শিল্পের অনিশ্চিত জীবনে।
তবে ছোট থেকে শুধু আবৃত্তি নয় আরেকটা জিনিসও আমি খুব ভালোবাসতাম তা হল নাচ। আমি যে ছোট্ট জায়গায় বড় হয়েছি সেখানে সবাই আমাকে ড্যান্সিং ডল বলে চিনত। ছোটবেলায় সিনেমার গানের সঙ্গে নিজেই নাচ প্রাকটিস করতাম।কত্থক,ভারত নাট্যম ও রবীন্দ্র নৃত্য ছাড়াও হিন্দি সিনেমার নাচ দেখে সবাই বলতো আমি নাকি একদিন বড় নর্তকী হব।তবে ছোট থেকেই যা করতে চেয়েছি তা একদম নিখুঁত ভাবে চেয়েছি । গান শেখার সময় ভেবেছিলাম লতা মঙ্গেশকর এর মতো হব আর নাচ— ভেবেছিলাম হেমা মালীনির কাছে শিখব।দাদু আমাকে এসবে প্রশ্রয় দিতেন তবে তাঁর উকিলের বুদ্ধি তাই বলতেন — যখন মেয়ে এরকমটা চাইছে তখন ওকে হেমা মালিনীর কাছেই নাচ শিখিও কিন্তু আগে তো অনেক পড়াশুনা করতে হবে।উনি বুঝেছিলেন ঐ সময় আমাকে এ কথা বলে শান্ত না করলে হয়তো উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্তই শুধু পড়া হবে।
পড়াশোনা ছাড়াও গান নাচের সঙ্গে বাবার হাত ধরে চলতে থাকল আবৃত্তি। তারপর কিছু দিন শিব সুন্দর বসুর কাছে চর্চা শুরু করি। আমার মাসিও ভালো আবৃত্তি করতেন তাই তার সঙ্গে আমার আবৃত্তির আলোচনা ও ভাবের আদান প্রদান হত।দাদুর কথা মতো ফিজিক্স নিয়ে পাশ করি বেশ ভালো ভাবে এবং একটা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় চাকরি ও পাই। কিন্তু ঐ যে আমি ছিলাম চলতি পথের বিপরীতে হাঁটা মানুষ তাই সেই চাকরি না নিয়ে আরো পড়াশোনা আর কবিতা চর্চায় মন দিলাম। এরপর আমার হঠাৎ ই বিয়ে হয়ে যায়।বড় মেয়ে তাই হয়তো আগেই বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বাবা।তবে বলে যে অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে সব হয়।তাই যে পরিবারে আমার বিয়ে হল সেখানে ও আমার এই খামখেয়ালীপনা বেশ প্রশ্রয় পেল আর আমি ও খুশি হলাম।যে মানুষটাকে পাশে পেয়েছিলাম তিনি পেশায় ডাক্তার হলেও তাঁর সংগ্রহে ছিল বহু কবিতার বই। শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি আমাকে উৎসাহ দিতেন সেই সব কবিতা পড়ার জন্য।তিনি রুগী দেখায় ব্যস্ত থাকতেন আর আমি ফিজিক্সে এসএসসি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুনতাম সব্যসাচী,গৌরী ঘোষ,পার্থ ঘোষ সবার কবিতা আর শেখার চেষ্টা করতাম।নাচ আবৃত্তির সঙ্গেই এরপর কিছুদিন হাওয়াইন গিটার বাজাতে শুরু করি।মালদায় থাকার সময় প্রবাল লালার কাছেও কিছু দিন আবৃত্তি চর্চা করি। এরপর আমার কলকাতায় চলে আসা।
একদিন সুমন্ত্র সেনগুপ্তের আবৃত্তি শুনে মনে হয়েছিল শিখলে এঁর কাছেই শিখব। আমার মতো উনিও তখন থাকতেন বেলঘরিয়াতে।শিখতে শিখতেই আকাশবানীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেখানে যোগ দিই কারন তা ছিল আমার পছন্দের একটা ভিন্ন পথ। অনেক কিছু শেখার সঙ্গে তরতরিয়ে চলতে লাগলো আমার আকাশবাণীর জীবন। কলকাতা গীতাঞ্জলি,সঞ্চয়িতা এবং মৈত্রী সব জায়গায় আমি সঞ্চালনাতে থাকতাম।আর দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি ফার্ম এড হোমে অর্থাৎ কৃষি বিভাগে। সবাই আদর করে বলতো চাষী বোন।সঞ্চালনা থাকলে বলতো এসে গেছে চাষী বোন,দেখা যাক আজ কী খবর দেয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে করতে বহু আধিকারিক ও কৃষক বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। চুপচাপ স্বভাবের আমি এই আকাশবাণীতে এসে অনেক কিছু শেখার সঙ্গে সঙ্গে অনর্গল কথা বলাও শুরু। তারসঙ্গে জড়িয়ে থাকি বাচিক শিল্পের সঙ্গে।
নাচটাকে একটু সরিয়ে রাখতে বাধ্য হই। শান্তিনিকেতনে গিয়ে গুরু শঙ্কর নারায়াণের কাছে নাচ শেখা বাড়ির সহযোগিতায়। কিন্তু এই সময়ে আমি দৃঢ়ভাবে কবিতাকে পেশা করার কথা ভাবি। অনেক মানুষের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে চলি। যে সময় কেউ ভাবেনি কোন মহিলা “ পৃথিবী” কিংবা “দেবতার গ্রাস” অথবা “বিদ্রোহী” বলবে আমি কিন্তু বলেছি কারণ সাহস একটু বেশি ছিল বরাবর। মঞ্চে আমার উপস্থাপনা ছিল ভয়হীন। দর্শকদের করতালিতে অনুপ্রাণিত হয়ে একের পর এক অনুষ্ঠান করেছি। আমি মনে করি দর্শকদের ভালোবাসাই একজন প্রকৃত শিল্পীর উপহার।আর তা শিল্পীকে এমন আনন্দ দেয় যা বহুমূল্য উপহারকে ম্লান করে দেয়।
এই এগিয়ে যাবার পথে পাশে পেয়েছি গুরু সুমন্ত্র সেনগুপ্ত ও পার্থ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। পার্থদা গুনী শিল্পী খুব বড় শিক্ষক, এগিয়ে দেন নিজের ছাত্র ছাত্রীদের। ওঁর কাছ থেকে আমি এই শিক্ষা টা পেয়েছি, তবে এও দেখেছি শুধু এগিয়ে দিতে গেলে, যে এগিয়ে দেয়– একসময় তার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়।তাই এ বিষয়ে আমি দুটোদিক রক্ষার পথেই এগিয়েছি।এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করেছে মনে হয় আমার পারশোনাল ম্যানেজমেন্ট শিক্ষার ডিগ্রী। কারণ অনেক সময় হয় কাউকে এগিয়ে দেবার পর সে অস্বীকার করে এবং ভুলে যায়।তবে বাবার কাছে ও যে শিক্ষা পেয়েছিলাম ছাত্র ছাত্রীদের উজাড় করে শেখানোর তা থেকে কিন্তু এক চুল ও নড়িনি।তাই যখন যাকে শিখিয়েছি মন প্রাণ উজাড় করে শিখিয়েছি।যে আমার কাছে সময় নিয়ে শিখতে চেয়েছে তাকে চেষ্টা করেছি একজন প্রকৃত শিল্পী হিসাবে গড়ে তুলতে।কত বেশী অনুষ্ঠান পেলো সেটা বড় কথা নয় যখন সে কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে তখন তার গুনগত মান যেন হয় সঠিক। তাদের আমি তাদের গলায় কী ধরনের কবিতা ভালো লাগবে সেইসব কবিতা শিখিয়েছি। তাদের সাহিত্য মুখি করতে সতত চেষ্টা করেছি। এমনভাবে তাদের তৈরি করেছি যে তার আবৃত্তির উপস্থাপনা যেন সবাই কে মুগ্ধ করে।
তবে এটাও ঠিক কবিতা সবাই বুঝতে পারে না। একবার রত্নাদির সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে গেছিলাম তিনি বলেছিলেন কবিতার শ্রোতা হয় মুষ্টিমেয়, কারণ সবাই কবিতা বোঝে না। আমি আমার গুরুজনদের কাছ থেকে সব সময় কিছু শেখার চেষ্টা করি। আবার একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পী বলেছেন কবিতাকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন গ্রামেগঞ্জে, মানুষের মনে। আমি দুটি বিষয়কেই সম্মান করি।তাই যখনই পেয়েছি বোদ্ধা দর্শক,শ্রোতা তখন এমন কবিতা চয়ন করেছি যা হৃদয় ছুঁয়ে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। আবার যখন হাজার হাজার মানুষের সামনে অনুষ্ঠান করেছি দেখেছি বহু মানুষের উন্মাদনা। কবিতার সঙ্গে কোন সম্পর্ক না থাকা মানুষগুলো সেখানে “লিচুচোর”ও “দাড়ে দাড়ে দ্রুম” শুনে যেমন মানুষ মজা করে তেমনি শুনেছে ছন্দের কবিতা।বহু মানুষের সেই ভালোবাসা আমাকে বেঁচে থাকার অক্সিজেন সরবরাহ করেছে। সংসারের নানা ওঠাপড়ায় মন খারাপ থাকলেও ঐ একটা সন্ধ্যার ভালো লাগা আমাকে আরো অনুশীলনের দিকে এগিয়ে দিয়েছে।ভেবেছি শুধু মাত্র চল্লিশোর্ধ মানুষ নয় আরো আরো মানুষ শুনুক কবিতা।
সবসময় আমি যা ভাববো তাই হবে এমনটা তো নয়। তাই দেখেছি ক্রমশঃ মঞ্চের সামনের আসনগুলো খালি হয়ে পড়েছে। কেন হয়েছে সেটা কেউ পর্যালোচনা করে নি।আজ অনেকেই না শিখে মঞ্চে উঠছে। ভাবে আবৃত্তি অতি সহজ জিনিস কারণ এখানে তাল নেই সুর নেই।সবাই বলছে সে শিল্পী। গুনগত মান কমছে,তাই শ্রোতাও কমছে।কবিতা ও আবৃত্তি বিষয় টা কিন্তু অতো সোজা নয়।এর মধ্যেও থাকে ক্ল্যাসিকাল কিছু ব্যাপার। তাই সঠিক ভাবে শিখতে হবে ও চর্চা করতে হবে। তবে যখন দেখি গুনী দর্শকরা আমাকে ভালোবাসছে সম্মান করছে তখন আবার আশা জাগে।দিল্লীতে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে ও সেটা দেখেছি। চল্লিশোর্ধ মানুষের মন ছুঁয়ে গেছে আমার কবিতা। তারপর যখন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের গর্বিত উজ্জ্বল মুখটা দেখেছি তখন মনে হয়েছে ভিন্ন পথে হাঁটা সার্থক হয়েছে।লক্ষ্ণৌতে আমার মা’কে একবার একজন বলেছিলেন আপনি তো রত্নগর্ভা। সেখানে উপস্থিত অধ্যাপিকা,কবি সাহিত্যিকরাও একথার সমর্থন করেছিলেন। তখন আবার ও মনে হয়েছিলো চেনা পথের চাকচিক্যে না গেলেও এ আমার অনেক পাওয়া। পূজোর সময় দীর্ঘ ষোল সতেরো বছর আমি অনুষ্ঠান করি বাইরে।পূজোতে সবাই যখন মেতে ওঠে নিজেকে সাজাতে ও ঠাকুর দেখা, খাওয়া দাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আমি তখন কবিতা নিয়ে মগ্ন থেকেছি— আবৃত্তিতে আনন্দ দিয়েছি মানুষ কে। সবার প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানোর সময় আমি মা দুর্গার দিকে মুখ করে শুনিয়ে গেছি একটার পর একটা কবিতা। জানি না আমার কবিতা বিশ্বের দরবারে সবার কাছে পৌঁছে গেছে কিনা কিন্তু আনন্দ পেয়েছি এভাবে পথ চলতে পেরে।দিল্লির ইন্ডিয়া হ্যাবিটেট সেন্টার,ইন্টার ন্যাশনাল সেন্টারে আবৃত্তি করেছি। কোনদিন নিজের প্রচার করিনি হুড়মুড় করে, তাই অনেকেই জানে না আমার অতীত। গুগল সার্চ করলে হয়তো জানতে পারবেন আমার ব্যাপারে।
এতো কথা লিখতে চাইলাম এই কারনে যে প্রথাগত ভাবে না এগিয়েও কবিতাকে ভালোবেসে এগিয়ে যাওয়া যায় একথা জানাতে।যে মানুষ লিখতে চান,যে মানুষ গাইতে চান বা আঁকতে চান সেই পথে এগিয়ে গেলে যে পরিতৃপ্তি পান তা অনেক টাকার চাকরি বা ঘোরাঘুরি ও কেনাকাটা করেও পাবেন না।এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় আশাপূর্ণা দেবীর কথা।তিন ধাপে তিনি মেয়েদের প্রতিবাদের কথা বলেছিলেন। প্রথম ধাপে সেই মেয়ে কে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল প্রতিবাদের জন্য। দ্বিতীয় ধাপে সুবর্ণলতা কিন্তু সংসারে থেকে ই লড়াই করেছে।তাই আমরা তাকেই বেশি গ্রহণ করেছি। একদিকে স্বদেশী আন্দোলনে ছেলে মেয়েদের সহযোগিতা ও তার সঙ্গে সংসার করেও লেখা এসব চালিয়েছেন।তার সঙ্গে সংসারের সবার হয়তো মনের মিল হয়নি কিন্তু সবাই মনে রেখেছে সুবর্ণলতাকে।
সত্যবতীর মেয়ে সুবর্ণলতা যেমন মায়ের আশা পূর্ণ করেছিল আমি ও চাই আমার মেয়েরা তা পূর্ণ করুক। না আমার কোন কন্যা সন্তান‌‌‌ নেই কিন্তু আমার তৈরি শব্দতীর্থের ছাত্র ছাত্রীরা যেন আমার সেই কবিতাকে মশাল করে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন কে আরো সুন্দর করে তোলে। কতজন সদস্য সেটা বিচার্য নয় প্রত্যেকেই যেন তার যোগ্যতা ও শৈল্পিক সত্ত্বা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। অনেক মহিলা ও পুরুষ আছে যারা সংসারের সমস্ত কিছু সামলেও সুন্দর সুন্দর লেখনীতে তাদের শিল্পী সত্ত্বাকে তুলে ধরেন আবার আবৃত্তি ও শেখেন– আমি তাদের সবসময় সম্মান করি এবং চেষ্টা করি এগিয়ে দিতে।
যদি বলেন শিক্ষকতা নাকি মঞ্চে উপস্থাপনা কোনটা বেশি ভালোবাসি তাহলে বলতেই হবে আগে নিজে পরিবেশন করে যে তৃপ্তি পেতাম শব্দতীর্থের ছাত্র ছাত্রীরা এখন পরিবেশন করলে তার থেকে কম আনন্দ পাই না। আমি তাদের পরিবেশন মন দিয়ে শুনি, মনে হয় আমার রূপ হয়ে ওরা এটা করছে।ভুল ত্রুটি আমার ও হয় আর সবার মতো।তাতে তারা অনেক সময় দুঃখ পায়।হয়তো সবসময় দর্শক হয় না।তবু আমি আশাবাদী যে একদিন সব আবার ফিরে আসবে। টেলিভিশন এর সিরিয়াল ছেড়ে মানুষ কবিতা শুনতে আসবে।
আমার শেষ শিক্ষা যে গুরুর কাছে তিনি পার্থদা। আমি সবসময় মনে করি গুরুকে সম্মান করতে হয়। নাহলে একজন মানুষ কখনও প্রকৃত শিল্পী হয়ে উঠতে পারে না। শুধু তাই নয় আরেকটা জিনিসও দেখা যায় গুরুর যখন ক্ষমতা থাকে তখন তাকে ঘিরে থাকলেও পরবর্তীতে তাকে সবাই এড়িয়ে যায়। তারপর ও যারা থেকে যায় তারা ভালো করে শিখবে বলেই থেকে যায়।কটা অনুষ্ঠানে যেতে পারলো না ভেবেই। পার্থদা আর আমার গুরু শিষ্যার অনুষ্ঠান মোট তিনবার হয়েছে। প্রথমবার সফল হয়েছি, অংশীদার করেছি বহু নাচের মানুষ কে। দ্বিতীয় বারে পারিবারিক নানা সমস্যার মধ্যে ও অনুষ্ঠান করেছি এবং শ্রোতারা আমাকে ফিরিয়ে দেননি। সবচেয়ে প্রশংসিত হলাম শেষবার।এটাই শেষ কিনা জানিনা।পার্থদার বয়স হয়েছে তাছাড়া আমার কথাও বলা যায় না কিছু ই।আজ আছি কাল নেই মানুষের জীবন তাই স্মৃতিতে থেকে যাবে এবারের অনুষ্ঠান। বেঁচে থাকলে বহু বছর পরেও এই স্মৃতি রোমন্থন করব। সেদিন একদিকে ছিল পার্থদার ‘সারথি’র ছাত্র ছাত্রীরা আর অন্য দিকে ছিল আমার শব্দতীর্থের ছাত্র ছাত্রীরা, ছিল আমার মা,ভাই,ভায়ের বৌ এবং আরো অনেকে।সদ্য স্বামীহারা মা যখন মন দিয়ে আবৃত্তি শুনেছে এবং তার মুখে পরিতৃপ্তি দেখেছি সেটাই আমার পরম পাওয়া।
আমার মা আমার বহু অনুষ্ঠানে সঙ্গে গেছেন। শব্দতীর্থের ছাত্র ছাত্রীরা থেকেছে। প্রথমবার বাংলাদেশে যখন মা আমার সঙ্গে যায় সেখানে গিয়ে তাদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছি। একুশে পদক পাওয়া মানুষ ছাড়াও বহু গুনী মানুষ আমার কবিতা শুনবে বলে এসেছেন।তারা ইউটিউবে আমার আবৃত্তি শুনে আমার অনুষ্ঠানে এসেছেন।এক হিসাবে এটাও আমার পাওয়া এছাড়া শব্দতীর্থের ছাত্রীদের নিয়েও চট্টগ্রামে গিয়ে অনুষ্ঠান করে এসেছি। আবার ও ডাকলে যাব।শেষে বলি আমেরিকা যাবার সুযোগ এলেও একা যাবার ভয় থেকে পিছিয়ে এসেছি। সেখানে আমার সঙ্গী পরিবারের কেউ বা সঙ্গতকারীকে নিয়ে যাবার মূল্য তারা দেবেন না। এভাবে একা যাবার কথা আমাদের মতো রক্ষণশীল পরিবারের মেয়েরা ভাবতে পারে না হয়তো এখন ও। পরবর্তীতে যদি সময় সুযোগ ঘটে নিশ্চয়ই যাব। আমার এই উত্তোরণের পথে যারা সাহায্য করেছেন তাঁদের আমি অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাই। বিনোদ সিংহানীয়া, খোকন হোসেন, প্রবাল লালা,সোমেশ নাথ,কেশবরঞ্জন,বিজন মুখোপাধ্যায়( দিল্লি),শ্যামল বোস, সৌমিত্র বন্দোপাধ্যায়,সুমন রহমান।আরো অনেকে আছেন যাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সৌমিত্র বন্দোপাধ্যায় প্রথম আমাকে দিল্লিতে সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আজ আর হয়তো তাঁর সঙ্গে কথা হয় না সেভাবে কিন্তু মনে রেখেছি তাঁর এই সুযোগ দেবার কথা। এভাবেই আমি সম্মান জানাই। এবার বলি সবাই কে যে আবৃত্তির প্রশিক্ষণের দরকার আছে।যারা ভাবেন ইউ টিউবে আবৃত্তি শুনেই শিল্পী হবেন সেটা ঠিক নয়। গুরুকে অনুকরন না করলেও অনুসরণ করুব।আর সঠিক ভাবে তৈরী হয়ে তবেই মঞ্চে উঠব। সামনের দর্শক আসন আস্তে আস্তে ভরবে। বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখুন।প্রথম ভাষা ইংরেজি হলেও দ্বিতীয় ভাষা বাংলা রাখুন।যেখানে একটা ভাষাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন করে একটা দেশ স্বাধীন হয়েছে সেখানে বাঙালি জাতি হিসাবে সেই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। নাহলে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, সুকান্ত আরো আরো অনেক কবির সৃষ্টি সব বিফলে যাবে।বাংলার মতো মিষ্টি ভাষাকে নিয়ে এগিয়ে চলুক আমাদের আগামী প্রজন্ম।